একটা ভাষা কখনই একা একা সমৃদ্ধ হতে পারে না। সেখানে অন্য ভাষার শব্দ যুক্ত হয় , হয়তো পুর্ণাংগ রূপে নয়ত পরিবর্তিত হয়ে। এই অ...
একটা ভাষা কখনই একা একা সমৃদ্ধ হতে পারে না। সেখানে অন্য ভাষার শব্দ যুক্ত হয়, হয়তো পুর্ণাংগ রূপে নয়ত পরিবর্তিত হয়ে। এই অভিযোজন বা adaptation যে জাতি, যে ভাষা নিতে পারে সে ভাষা তত সমৃদ্ধ হয়।
এই বঙ্গীয় সভ্যতা তৈরি থেকে এখন
পর্যন্ত অনেক বিদেশি ভাষা
মিশেছে আমাদের বাংলা ভাষায়। বিশেষ করে এই উপমহাদেশিয়
বেল্ট এর যে ভাষাগুলো
আছে, যেমন- বার্মিজ, হিন্দি, উর্দু, ফারসি ইত্যাদি এবং বাংলায় যে
সকল অঞ্চলের মানুষ বাণিজ্য করতে আসতো যেমন পর্তুগিজ, আরব,
ডাচ, ইংরেজ, ফ্রান্স ইত্যাদি ভাষার বিভিন্ন শব্দ যুক্ত হয়েছে
আমাদের ভাষায়। পার্শ্ববর্তি দেশ হওয়ার কারণে
হিন্দি, উর্দু ও বার্মিজ শব্দের
বাহুল্য দেখা যায়। হিন্দি
শব্দের মধ্যে উল্লেখযোগ্যঃ দোস্ত, ঝামেলা, ঝাড়ি, কুস্তি ইত্যাদি। আমাদের বহুল ব্যবহৃত
“পুইশাক” কিন্তু ওড়িষা ভাষার শব্দ। আবার লুঙ্গি – বার্মিজ শব্দ। তবে শব্দভান্ডারে সমৃদ্ধতা
ও উচ্চারণে মাধুর্যতা থাকায় উর্দু শব্দ এসেছে প্রচুর। অনেক প্রশাসনিক শব্দ কিন্তু উর্দু
ভাষার, যেমনঃ আদালত, তফসিল, জামিন, হুকুম, নবাব, উজির, দরবার ইত্যাদি। আবার মুসলমানদের
অনেক ধর্মিয় শব্দ কিন্তু উর্দু শব্দের – নামাজ, রোজা, কিয়ামত, জান্নাত, দোজখ, দোয়া,
আজান, সুন্নত, ফজিলত ইত্যাদি। যদিও এগুলার বেশিরভাগ আরবি কিংবা ফারসি থেকে উর্দু হয়ে বাংলায় আসা। আবার আদব, তামিজ, নফরত, দুশমন,
বদনাম, বদমাশ, গরিব, হিসাব, দরখাস্ত, গুজব, সাহস, খুশি ইত্যাদি শব্দগুলো উর্দু থেকে
সরাসরি বাংলায় ঢুকেছে এবং বাংলা শব্দের অংশ হয়ে গেছে। এইগুলার সরাসরি বিকল্প শব্দ আপনি
বাংলা শব্দে পাবেন না।
আবার
ইসলামের প্রসার এবং সুলতানি ও মুঘল শাসনব্যবস্থার
কারণে প্রচুর আরবি ও ফারসি ভাষার শব্দ বাংলায় এসেছে - দুনিয়া, মানুষ, হিসাব, দরজা,
কাগজ, বাজার ইত্যাদি। শাসনব্যবস্থা ও আরেকটা গুরুত্বপুর্ণ কারণ বিদেশি ভাষার শব্দ বাংলায়
ঢুকার। ২০০ বছরের ইংরেজ শাসনামলে প্রচুর ইংরেজি ভাষা আমাদের বাংলায় ঢুকেছে - স্কুল,
কলেজ, বাস, ট্রেন, অফিস, ম্যানেজার, ক্লাস, প্রজেক্ট, মোবাইল ইত্যাদি।
যখন যে শাসনআমল
চলত, বেশীরভাগ সময় সে ভাষা হত প্রশাসনিক ভাষা। এবং এ অঞ্চলের মানুষ মাতৃভাষার পাশাপাশি
সে প্রশাসনিক ভাষা ও আয়ত্ত্ব করতো। এখানে আবার উপনিবেশবাদের একটা প্রভাব আছে। যেমন
ইংরেজ আমলে ইংরেজি যারা জানতো তারা হত সভ্য, এলিট ও শিক্ষিত মানুষ। সে কথা পরে একদিন
বলবো। আজ কেবল পার্শ্ববর্তি ভাষাগুলো নিয়ে বলি। ভৌগলিক, রাজনৈতিক, বাণিজ্যিক, সাংস্কৃতিক
বিভিন্ন কারনে বাংলার মানুষের সাথে সরাসরি আনাগোনা ছিল হিন্দুস্থানের প্রায় প্রতিটি
প্রান্তের মানুষের। এর মধ্যে ততকালিন বোম্বে, মাদ্রাজ, কলিকাতা, লাহোর, করাচীর সাথে
সম্পর্ক ছিল বেশি। যার কারণে এ অঞ্চলের সাধারণ মানুষ ও বাংলার পাশাপাশি হিন্দি, উর্দু
টা কমবেশি বুঝতো। বাংলা ভাষার পাশাপাশি উর্দু, ফারসি, আরবি শিখার প্রবণতাও ছিল বেশী।
কিন্তু ১৯৪৭
এ ভারত-পাকিস্তান, ১৯৭১ এ পাকিস্তান-বাংলা আলাদা হয়ে যাওয়ার পর এখানে ভাষা আদান প্রদানের
পরিমাণ কমে যায়। তবে গ্লোবালাইজেশনের যুগে মোবাইল, বিনোদন মাধ্যম, ইন্টারনেট এর কারণে
এটা আবার নতুন আঙ্গিকে তৈরি হয়।
এখন প্রশ্ন
হচ্ছে আমরা আমাদের ভাষায় কি বিদেশি ভাষা ঢুকতে দিব না? না দিলে কি হবে?
এই প্রশ্নের
উত্তর দেওয়ার শুরুতে একটা তথ্য দেই- প্রতিবছর অক্সফোর্ড ডিকশনারি তে নতুন নতুন শব্দ
যুক্ত হয়, এর মধ্যে অনেকগুলো বিদেশী শব্দ। আমাদের বাংলা শব্দের ও অনেক শব্দ আছে সেখানে।
যেমন – আচ্ছা, চাচা, আব্বা, কিমা, চামচা ইত্যাদি।
ভাষাবিজ্ঞানের
দৃষ্টিতে বললে ভাষায় বিদেশি শব্দ ঢোকা স্বাভাবিক, এবং এটা সম্পূর্ণ বন্ধ করা অসম্ভব।
কারণ - ভাষা সবসময় বদলায়, সামাজিক যোগাযোগ বদলায়, নতুন প্রযুক্তি–বিজ্ঞান আসে,
সংস্কৃতির আদান–প্রদান হয়। ভাষা হচ্ছে নদীর মত প্রবাহিত, এখানে অন্য নদীর শাখা এসে
মিশবেই।
এখন যদি গোঁড়ামি
করে বলি, না, আমরা বিদেশি শব্দ ঢুকতে দেব না, বিদেশি শব্দ রাখবো না, তাহলে কি কি হতে
পারে জানেন?
কম্পিউটার কে
কি বলে ডাকবেন? অণুগণক? চেয়ারকে ডাকবেন কেদারা? সফটওয়ার, ইন্টারনেট এর বাংলা কি দিবেন?
মোবাইলকে কি বলে ডাকবেন? বাংলাদেশের এক জাতীয় পত্রিকা একবার “ মোবাইল” শব্দের একটা
বাংলা বের করেছিল – মুঠফোন। এই দেখেন, এখানে আবার “ ফোন” ইংরেজি শব্দ।
আচ্ছা চলেন
তো দেখি, উর্দু ভাষা বাদ দিলে কি কি হবে?
সর্বনাশ!! তখন
তো আসামি কে “আদালতে” নিতে পারবেন না, “জামিন” চাইবেন কিভাবে? নির্বাচনের “তফসিল” দিবেন
কিভাবে? “কিয়ামতে” ভয় করে “নামাজ”, “রোজা” করবেন না? স্কুল কলেজে “দরখাস্ত” পাঠাবেন
কিভাবে? ব্যবসায় “হিসাব” করবেন না? “গরিব” মানুষদের কি একেবারে ভুলে যাবেন?
মিডিয়া ব্যবহার,
ইন্টারনেট এর ব্যবহার এর কারণে উর্দু এর পাশাপশি আমরা কিন্তু প্রচুর হিন্দি শব্দও ব্যবহার
করি। বরং উর্দু থেকে বেশী করা হয়। সেটাকেও কি বাদ দিবেন?
রাজনৈতিক, কুটনৈতিক
কারণে আমাদের পার্শ্ববর্তী দেশগুলোর সাথে আমাদের বিভেদ থাকতেই পারে। কিন্তু সে বিভেদের
প্রভাব ভাষা-তে পড়া ঠিক না। এতে আমরা নিজেরাই পিছিয়ে থাকব। এখন পর্যন্ত এ অঞ্চলের এমনকি
বিশ্বের প্রাচীন ও সমৃদ্ধ ভাষার মধ্যে বাংলা অন্যতম। বাংলা বিশ্বের প্রায় ২৮ কোটি
মানুষের মাতৃভাষা এবং প্রায় ৭,০০০ এর
ও বেশি ভাষার মধ্যে বাংলা ৭ম। এটাকে আমাদের আরো সমৃদ্ধ করতে হবে, আমাদের
শব্দ ভান্ডার বড় করতে হবে। ভাষা কোনো তালাবদ্ধ ঘর নয়, আবার কোনো উজাড় মাঠও নয়।
দরজা খোলা থাকবে — তবে নিজের উঠোনের গাছগুলোকেও বাঁচাতে হবে। আমরা আজাদি – ও বলবো,
স্বাধীনতা – ও বলবো, ইনকিলাব – ও বলবো, বিপ্লব – ও বলবো। আমাদের ইনসাফ ও হবে, সুবিচার
ও হবে। এতে বাংলা – বাংলাই থাকবে। বরং হবে আরো সমৃদ্ধ।
-
আবরার
শাকিফ খান
এক্সিকিউটিভ ডিরেক্টর, আনকোরা

No comments